গল্পঃ #__কনে_বদল
তাসলিমা মুন্নী
পর্ব : ০১
এই পাপ আমাকে করতে বলো না,তোমার পায়ে ধরি মা । আমি এটা করতে পারবো না। এটা অন্যায়, এটা পাপ!!
--- একদম চুপ মেরে থাকবি শিখা। পাপ- পূণ্য আমাকে শেখাতে আসবি না।একটা শব্দও যেন না শুনি।শুনলে খুব খারাপ হবে।
দরজা আটকে চলে গেছে শিখার মা।
একটু পরে শিখার ছোট বোন শশী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।
--- আপু..
--- শশী...বোন আমাকে বাঁচা।এতো বড় অন্যায় আমি করতে পারবো না।
শশীর চোখেও পানি এসে গেছে শিখার কাকুতি মিনতি দেখে।
আজ শিখার বিয়ে। বিয়ে নিয়ে আর পাঁচ দশটা মানুষের মতো ভাবতে পারছেনা শিখা। ওর চোখে এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।শিখা জানে না কি হবে, তবে এটা জানে যা হবে, খুব খারাপ কিছু হবে।
যে ছেলেটার সাথে বিয়ে, তার নাম মাহির।সেও জানে না কি হতে যাচ্ছে। জানে শুধু শিখার বাড়ির কয়েকজন মানুষ।
কনে বদলে গেছে। বিষয়টি অনিচ্ছাকৃত বা বাধ্য হয়ে করা হচ্ছে এমন নয়। এটা সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পনা করে হচ্ছে। শিখা নিজেও জানতো না। বিয়ের আগের রাতে জানতে পেরেছে বিয়েটা শিখার!! বিয়েটা ভেঙে দিবে বা ছেলেকে, ছেলের বাড়ির কাউকে জানাবে এই সুযোগও নেই।
শশী শিখাকে ধরে কাঁদছে।
--- আপু, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।
শিখা নিজেও জানে শশীর কিছু করার নেই। তবুও ভেসে যাওয়ার আগে মানুষ শেষ চেষ্টা করে,
খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা।
শিখাকে বউ সাজিয়ে একটা ঘরে আটকে গেছে ওর মা।এদিকে বর এসে গেছে। বরযাত্রী অনেক দূর থেকে এসেছে। তাই খুব বেশি মানুষ আসেনি। বরের বাড়ির কেউ শিখার সাথে দেখা করার সুযোগ পায়নি।খুব কৌশলে আটকে দেয়া হয়েছে। কনের সাজ শেষ হয়নি বলে ভেতরে যাবার অনুমতি নেই কারো। বিয়ে পড়ানোর একটু আগে শিখার মা এসে কানে কানে শিখাকে বললেন
--- ঘোমটা খুলবি না, কোনো ঝামেলা না করে কবুল বলবি। না হলে এই দেখ!
বিষের শিশিটা দেখালেন। আমি তোর মা।আমি আবার অনুরোধ করছি কোনো ঝামেলা করবি না, করলে শশী আর আমি দুজনেই বিষ খাবো। এখন তুই জানিস তুই কি করবি।হয় বিয়ে করবি না হয় এটা শশীকে খায়িয়ে আমিও খাবো।
--- মা....!!তুমি আমাকে এতো একটা অন্যায় করতে বললে!! তারচেয়ে জন্মের পরে আমার গলায় বিষ ঢেলে দিতে!!
শিখারর মা মুখশক্ত করে উঠে চলে গেলেন।
.
.
.
বিয়েটা হয়ে গেছে। এছাড়া আর কোনো পথ ছিলো না শিখার।বরযাত্রী কনে নিয়ে বিদায় হলো।এখনো কেউ জানতে পারলো না কনে বদলে গেছে। শিখাকে নিয়ে বরযাত্রী ফিরে যাচ্ছে।
শিখা জলে যাচ্ছে।হা জলেই যাচ্ছে। যে শ্বশুর ঘরে যাচ্ছে সেখানে নিশ্চয়ই তার জন্য কেবল জল আর জলই আছে। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ওর । সাথেও কেউ আসেনি।যেন হাত পা বেঁধে জলে ফেলে পুরো পরিবার বেঁচে গেছে! এতো শত ভাবনা আর দুঃচিন্তার করতে করতে শ্বশুর ঘরে পৌঁছে গেলো শিখা। সবাই দৌড়ে এসে বউবরণ করে ঘরে তুললো।। সবাই এলো নতুন বউ দেখতে।
ঘোমটা খুলে বউ মুখ দেখাতে গিয়ে মাহিরের ভাবি ইভা চিৎকার করে উঠলো,
--- এটা কি!!!
--- কি হয়েছে? কি হয়েছে? মাহিরের মা দৌড়ে এলেন।
--- এ মেয়ে তো সেই মেয়ে না!! বউ বদলে গেলো কি করে?!!
বিস্মিত চোখে ইভা জিজ্ঞেস করলো,
--- কি! এতো বড় জোচ্চুরি!
ইভা তোমার শ্বশুরকে ডাকো। কই তুমি? তাড়াতাড়ি এদিকে আসো।মাহিরের মা মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন!! আমার ছেলের জীবনটা শেষ করে দিলো!
মাহির, মাহিরের ভাই মাহিন , মাহিরের বাবা সবাই চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে এলেন।।
--- কি হয়েছে? এতো চেঁচামেচি কিসের?
--- কি হয়েছে? দেখো... দেখো...
শিখার ঘোমটা টেনে সরিয়ে দেয় মাহিরের মা।
--- একি! এ আবার কে?? এসবের মানে কি?
--- মানে বুঝোনি? তোমার ছেলের কপাল পুড়েছে! বউ বদলে দিয়েছে!. ঠকিয়েছে!!
--- কি!!
--- বাবা,তুমি এক্ষুনি ফোন করো।
মাহিন সারোয়ার সাহেবকে বললো,
--- হা.... ফোন তো দেবোই! সাথে জেলের ভাত খায়িয়ে ছাড়বো। এত বড় ফ্রড!
মাহির চুপচাপ রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে শুনছিলো। এবার সে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।শিখার দিকে ফিরেও দেখলো না।এদিকে শিখার অবস্থা! লজ্জায় অপমানে মাটিতে মিশে যেতে পারলে বেঁচে যেতো!ওর মা ওকে কিসের মধ্যে ফেলে দিলো!!এরচেয়ে মৃত্যু ঢের ভালো ছিলো।
--- এই মেয়ে তোমার নাম কি?
কি হলো কথা বলছো না কেন? সারোয়ার সাহেব ধমকে জিজ্ঞেস করলেন। শিখা ভয়ে চমকে উঠে,কাঁদতে কাঁদতে বলে,
--- শি-শিখা..
--- অহহ! এই আসল শিখা! ফ্রড তো প্রথমেই করেছে এখন বুঝতে পারছি।
সারোয়ার সাহেব শিখার মামাকে ফোন করলেন। প্রচন্ড রাগারাগি করলেন। শিখার মামা অনেক কিছু বুঝাতে চাইলেন, কিন্তু সারোয়ার সাহেব এসব কথা শুনতেই চাইলেন না।বললেন,
--- আপনাদের মেয়েকে এসে নিয়ে যান।
--- বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আপনার বাড়ির বউ আপনি কি করবেন সেটা আপনি জানেন।।
এটা বলেই শিখার মামা ফোন রেখে দিলেন।
সারোয়ার সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন।উনি এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। যা-ই করেন না কেন ভেবে চিন্তে করতে হবে। মান সম্মানের একটা ব্যাপার আছে!!
--- কি হলো? এতো রাত হয়ে গেছে এই মেয়েকে পাঠাবে কখন?
--- একটু একা ছেড়ে দাও আমাকে। তোমার সবাই যাও এখান থেকে। আমি মেয়েটার সাথে কথা বলবো।
--- ওর সঙ্গে কথা বলে কি হবে?!! বিদায় করো এক্ষুনি।
--- আহ! যাও তো।।
সারোয়ার সাহেব অত্যন্ত রাগী মানুষ। সবাই বাঘের মতো ভয় পায় উনাকে। তাই আর কিছু বলার আগেই সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। সারোয়ার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
--- এই মেয়ে, তুমি জানো তুমি কি করেছো?আমার ছেলের জীবন নিয়ে তোমরা খেলেছো।এতো বড় জুচ্চুরি কেন করা হয়েছে আমাকে বলো।শিখা মাথা নিচু করে কেঁদেই চলছে।
--- কি আশ্চর্য! তোমাকে তো কথা বলতে হবে। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু।তোমার মায়ের নাম্বার দাও।
শিখা কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল থেকে ওর মায়ের নাম্বার টা বের করে দিলো। শিখার মায়ের সাথে প্রায় একঘন্টা কথা বলেন সারোয়ার সাহেব। তারপর মাহিরকে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। শিখা, মাহির, সারোয়ার সাহেব মুখোমুখি বসে আছে।শিখা মাথা নিচু করে বসে আছে। মাহির অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।
--- মাহির।
--- জী বাবা।
--- জন্ম,মৃত্যু আর বিয়ে এই তিনটি জিনিস মানুষের হাতে থাকে না।এটা তুমি বিশ্বাস করো?
--- করি।
--- এই যে মেয়েটা ' শিখা', ওর সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে ; এটাও তোমার ভাগ্যে ছিলো।তোমাকে শিখার সামনে কিছু কথা বলি।তোমরা দুই ভাই আর তোমাদের বোন আনিশা আর আনিকা, তোমরা যখন যা চেয়েছো তা-ই তোমাদের দিয়েছি।কোনো দিন কিছু চাইনি তোমাদের কাছে।আজ তোমার কাছে আমার চাওয়া আছে। এটাকে চাওয়া বলো আর অনুরোধই বলো, এটা তোমাকে রাখতে হবে।
--- বাবা,তুমি কি বলতে চাইছো?
--- শিখার সাথেই তোমার সংসার করতে হবে।
--- কিন্তু বাবা...
--- আমি তোমার কাছে কিন্তু আশা করছি না মাহির।
--- এটা ফ্রড করে বিয়ে। আমি কিভাবে..!
--- এতে দোষ থাকলে মেয়েটার পরিবারের।এই মেয়ের দোষ নেই।ওকে বাধ্য করা হয়েছে।
--- বাবা আমি...
--- এই মেয়ে এখানেই থাকবে এটাই আমার শেষ কথা। এখন যাও গিয়ে বিশ্রাম করো।
দীর্ঘ দুই ঘন্টা পরে সারোয়ার সাহেব দরজা খুলে বেড়িয়ে ইভাকে ডেকে বললেন,
--- শিখাকে নিয়ে ওর ঘরে যাও।ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।
--- কিন্তু বাবা....
--- আমি তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছি, ইভা।
--- আচ্ছা বাবা।
ইভা মুখ কালো করে শিখাকে বললো,
--- এসো আমার সাথে।।
ইভা শিখাকে নিয়ে চলে গেলো।
.
.
.
--- তুমি এটা কি করলে? এই মেয়ে এখানে থাকবে??!! জুচ্চুরি করে বিয়ে দিয়েছে। এখন এই মেয়ে নিয়ে আমার ছেলে সংসার করবে?
--- আফরোজা, মেয়েটা এখানেই থাকবে। এটা নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাই না।
--- কেন বলবো না? আমার ছেলের জীবন নিয়ে কথা! এই মেয়েকে আমার ছেলের পাশে কোন দিকে মানায়?আর দেখো, এই মেয়ে মাহিরের চেয়ে বয়সে বড় হবে।
--- কি শুরু করেছো!! খাবারের ব্যবস্থা করো। অনেক রাত হয়ে গেছে।
সারোয়ার সাহেবের মুখের উপর আর কথা বলার সাহস নেই আফরোজা বেগমের। তাই উনি বিরক্তি নিয়ে চলে গেলেন।
রাত প্রায় তিনটা বাজে। মাহির রুমে আসলো।কাঁদতে কাঁদতে শিখার চোখ ফুলে গেছে। মাহিরকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো।মাহির চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়লো।শিখা কি করবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়েই রইলো। বেশ কিছুক্ষন পরে মাহির তাকিয়ে দেখে শিখা দাঁড়িয়ে আছে।
--- এই মেয়ে শুনো, বাবার জন্য এবাড়িতে এমনকি এই রুমে থাকার অনুমতি পেয়েছো।কিন্তু তাইলে বলে ভেবো না আমার স্ত্রীর যায়গা পাবে।।দুই দিন আগে আর পরে এই বাড়ি তোমাকে ছাড়তেই হবে। এখন রোবটের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে নিচে চাদর পেতে শুয়ে পড়ো।আর ভুলে আমার সামনে পড়বে না।এটা বলেই মাহির বালিশ ছুড়ে দিলো।
শিখা এটার জন্য প্রস্তুত ছিলো বোধহয়। কারণ ওর মধ্যে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি।শুধু চোখ থেকে টপটপ করে কিছু পানি ঝরে পড়ছে।শিখা বালিশ টা নিয়ে ফ্লোরে একটা চাদর পেতে শুয়ে পড়লো।
চলবে....
আমাদের ওয়েবসাইটে আপনার লেখা দিন। প্রতিমাসে একজন সেরা লেখককে সম্মাননা দেয়া হবে।
.jpeg)
Comments
Post a Comment