অভিক ও ঈদের এক ফালি চাঁদ
____মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
অভিক অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ,অনেক দিন থেকেই সে হার্টের জটিল রোগে আক্রান্ত। তার পরেও অভিক নিজের সংসার আর দুটি মেয়ের দিকে চেয়ে বেশ নিরিবিলি ভাবে কোনোক্রমে জীবনটাকে চালিয়ে আসছিলো।
অভিকের ছোট মেয়েটা এবার ইন্টারে পড়ে,চোখে তার অবারিত স্বপ্ন। এখনো ওর মাঝ থেকে ছেলেমানুষি ভাবটা যায় নি।
অভিকের বাস্তব জীবনটা যেন কোন ভাবেই ওর স্বপ্নের উপর প্রভাব ফেলতে পাছে না।
ছোট মেয়ের যেন বায়নার শেষ নাই। ঈদে এটা ওটা ওকে কিনে দিতে হবে। সবার কেনা কাট দেখে সেও মনে মনে চিন্তা করে ,হয়ত সেও এবার ঈদে অনেক কিছু কিনবে।
ওর কথা শুনে অভিক সব সময় বলতো,
" দিব মা, তোমাকে সব কিনে দিব।"
অভিক যেহেতু অসুস্থ আর কর্মহীন তাই অভিক সবি সহ্য করে যেতো নিজের মনের মাঝে। বুকের মাঝে কষ্ট গুলিকে পুষে রাখতে রাখতে অভিক আজ বড্ড ক্লান্ত। বুকের কষ্টগুলো শেষ পর্যন্ত বুকের ব্যথায় রূপ নিলো।
বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে অভিক বাসার বিছানায়।
মেয়ে দুটি অভিকের কাছে আসলো,ওদের চোখে পানি টলমল করছে।
মেয়েরা বললো,
" আব্বু ঈদ তো সারা সময় করলাম,সামনের বছর তো আবার ইদ আসবে তখন নয় আমরা ইদ করবো।"
এ কথা শুনে যেন অভিকের বুকের সমস্ত পাঁজর গুলো ভাঙান স্পষ্ট হতে লাগলো,অভিক তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করলো।
মেয়েদের সান্ত্বনা যেন ওর বুকের মাঝে এক প্রবল ঝড় সৃষ্টি করলো। সারাটা সময় অভিক ভাবতে লাগলো কি ছিল তার অন্যায় যার জন্য জীবনের এমন বাস্তবতার মুখে দাঁড়াতে হলো তাকে?
কোন উত্তর তার জানা নেই।
এদিকে দিন গড়াতে থাকে ঈদের আর দিন কয়েক বাকী অভিকের ব্লকটা আস্তে আস্তে যেন অভিকের সমস্ত জীবনীশক্তি ম্লান করতে থাকে।
অভিকের ছোট মেয়েটা বার বার অভিকের কাছে আসে।
না,এখন আর সে নানা রকমের নানা বায়না কারে না, সে তো বুঝতে পারছে কোন অজানা ঝড়ে আজ তারা বিধ্বস্ত।
কেবল অভিকের চোখের জল আজ অভিকের এক মাত্র সম্বল।
ছোট মেয়েটাকে কাছে ডেকে শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
" মা তোমার যা লাগে সব এনে দিবো।"
মেয়ে বাবার অশ্রু শিক্ত নয়নের দিকে তাকিয়ে কি যেন এক অজানা সান্ত্বনা নিয়ে পাশের রুমে চলে যায়।
অভিকের বড় মেয়েটা শুরু করে টিউশনি, হয়ত সে বুঝে গেছে তার জীবনের পড়াশুনার পাঠটা বোধ হয় এবার চুকল।
আপনারা সবাই হয়ত নিশিকে চিনেন,
হ্যাঁ, অভিকের ভালোবাসা। অভিকের অসুস্থতার পরে সে যেন কেমন হয়ে গেছে। কেমন যেন স্থির চিত্রের মতন তার জীবন।
সময় হয়ত অভিকের সংসারটাকে আর এক সুতায় বাঁধতে দিবে না।
ঈদের বাকী আর ২ দিন ক্রমে ক্রমে রাত গভীর থেকে গভীর হতে লাগলো আর অভিক একান্ত মনে ভাবতে লাগলো তার জীবনের কথা, জীবনে বয়ে যাওয়া হঠাৎ ঝড়ের কথা।
২ দিন পরে ঈদ হবে সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হবে,নতুন কাপড় পড়ে সবাই চারিদিক ঘুরে বেড়াবে ।
কেবল সবার আড়ালে অভিক আর তার মেয়েরা পার করবে ভয়াবহ এক দীর্ঘ দিন।
জীবনের কাছে আর সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার কাছে হেরে গেল আজ অভিকের সমস্ত জীবন।
সমাজটা বড় নিষ্ঠুর, এখানে কেউ কারো নয়। সবাই একান্ত আত্মকেন্দ্রিক। অভিকের দিকে তাকাবার সময় কারো নেই।
এ সব ভাবতে ভাবতে অভিকের সমস্ত শরীর ঘেমে উঠলো,বুকের চাপটা চারিদিক দিয়ে ক্রমশ বাড়তে লাগলো, ঐ দূরে জ্বলে থাকা আলোটা কেমন যেন আরো দূরে সরে যেতে লাগলো,চারপাশের শব্দগুলো কেমন যেন অস্পষ্ট মনে হতে লাগলো অভিকের কাছে।
এর মাঝে অভিকের চোখে ভেসে উঠলো ঝলমলে ওর মেয়েদের মুখ আর আবছা সরু ঈদের এক ফালি চাঁদ।

Comments
Post a Comment