অভিকের মেয়ের কান্না
__মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
আপনারা যারা আমার লেখা পড়েন, আপনারা সবাই জানেন আমার গল্পের অভিকের কথা, অভিকের বর্তমান বাস্তবতার কথা।
আজ আমি আপনাদের কাছে তুলে ধরবো অভিকের বর্তমান অবস্থা।
অভিকের ছোট মেয়েটা দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়ে গেছে। কিন্তু মনে হয় এই তো সেদিন ও অভিকের জীবনে খুশির বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল। সে সময় অভিকের বয়সও কম ছিল,মনে হতো ছোট্র একটা জীবন্ত পুতুল যেন অভিকের সাথে সমস্ত সময় খেলা করতো।
তার পর সময় আস্তে আস্তে বয়ে যেতে লাগলো নদীর স্রোতের মতন। অভিকের সেই ছোট্র পুতুলটি এক সময় নিজেই পুতুল খেলা শুরু করলো, এক সময় অভিকের মেয়েটার পুতুল খেলার বয়সটাও পার করলো।
অভিকের মেয়েটা স্কুলে যেতে লাগলো। অভিক প্রথম যেদিন ওকে স্কুলের পোশাকে দেখলো অভিকের মনটা কেমন যেন এক অজানা খুশিতে ভরে গেলো।
সময় কখনো থেমে থাকে না, ভরা নদীতেও পড়ে সরু বয়ে চলার স্মৃতি চিহ্ন।
অভিকের মেয়েটাও তার স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করলো কলেজ জীবনের অধ্যায়ে, ওর কলেজ জীবনের ১ম বর্ষে অভিকের জীবনেও নেমে এলো এক মহা বিপর্যয়। অভিকের শারীরিক অসুস্থতা যেন প্রচণ্ড বেগে আঘাত হানলো অভিকের পরিবারের উপর।
চরম শারীরিক অসুস্থতায় অভিক কোন ভাবেই চাকুরি করতে পারছে না যার কারণে অভিক হয়ে গেলো সম্পূর্ণ বেকার।
কিন্তু, প্রকৃতি কিংবা সময় তো আর অভিকের জন্য থেমে থাকবে না, এটাই নিয়ম। এ নিয়মে এক সময় অভিকের মেয়ের পড়াশুনায় প্রচণ্ড বাধা সাধলো অভিকের আর্থিক সমস্যা।
এই সময়টাই অসম্ভব হয়ে উঠলো ওর পড়াশুনার ভবিষ্যৎ, ঠিক এমন কঠিন সময়ে অভিকের সামনে এগিয়ে আসলো না কেউ।
অভিকের চলমান জীবনটা থমকে দাঁড়ালো। কলেজের বেতন, টিচার আর কোচিং এর বেতনের অভাবে অভিকের ছোট মেয়েটার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা যোজন যোজন দুরে সরে যেতে লাগলো। ছোট মেয়ের প্রতিদিনের কান্না অভিকের স্থির পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দেয় প্রতি দিন। এ যেন জীবন থাকতেও মরণের স্বাদ।
নিষ্ঠুর সময় তার প্রবল আঘাতটা হানে অভিকের উপর, শত চেষ্টার পরেও একটা চাকুরি কোথায় পাচ্ছে না।
তাই বলে সংসার কিংবা খরচ কোনোটাই তো আর থেমে থাকে না।
তাই সব লাজ লজ্জাকে কবর দিয়ে হাতের কলমের জায়গায় অভিক সারারাত কাওরান বাজারের ফুটপাতে রাস্তার ধারে ফেরি করা শুরু করে।
সমাজের কাউকে জানতে দিলো না সে কথা।
নিজের হার্টেরর বিশাল অপারেশনের ক্ষত নিয়েই ঝাপিয়ে পড়লো জীবন সংগ্রামে।
রাতের অন্ধকার অভিকের সবচেয়ে বেশী ভয়,সেই অন্ধকার হয়ে গেলো অভিকের সাথি।
রাতের অন্ধকার আর ফেরি করা অভিক দিনের আলোয় সমাজের সকলের সাথে প্রতি নিয়ত ভালো থাকার অভিনয় হয়ে উঠলো অভিভিকের জীবনের একটা অংশ।
দিনের বেলায় অভিকের স্বাভাবিক ভালো থাকার জীবনটা দেখে কেউ বুঝতেও পারেনা অভিকের রাতের নীরব কান্নার সেই ক্ষত।
সমাজের সাথে আর নিজের সাথে অভিনয় করতে করতে যে সময় অভিক বড্ড ক্লান্ত, যে সময় অভিকের মেয়েদের পড়াশুনার খরচটা অভিকের কাছে পাহাড় সম মনে হতে লাগলো।
রাতের শারীরিক পরিশ্রম আর মেয়ের পড়াশুনার চিন্তা অভিককে আবার মনে করিয়ে দিলো তার হৃদয় যন্ত্রটা ভালো নেই।
প্রচণ্ড ব্যথা,যেটা সহ্যের সীমানাও অতিক্রম করেছে।
অভিক কারো কাছে হাত পেতে ভিক্ষা নিতেও পারছি না। অবশেষে অভিক সিদ্ধান্ত নিলো না আর নয়; আর নয় নিজের সাথে নিজেকে ছোট করার প্রয়াস। তাই বাধ্য হয়ে অভিকের ছোট মেয়ের পড়াশুনাটাই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
অভিক তার জীবনে তার মেয়েদেরকে ৩ বার কাঁদতে দেখেছে,
প্রথম বার ওরা যখন পৃথিবীর বুকে আসলো,সে দিন ওরা প্রচণ্ড কান্না করেছিলো হয়ত ওরা বুঝতে পেরেছিলো জন্মই তার আজন্মের পাপ।
দ্বিতীয় বার ওদেরকে অভিক কাঁদতে দেখেছিলো যে দিন অভিকের হার্টের অপারেশনের পরে প্রথম বার চোখ খুলে তাকালো অভিক।
আর আজ তৃতীয় বার যখন তারা জানতে পারলো তার আর পড়াশুনা হবে না সে আর ডাক্তার হতে পারবে না ।
একজন বাবার কাছে তার আদরের সন্তানের কান্না যে কতটা ভয়ানক হতে পারে তা বাবা না হলে হয়ত কেউ বুঝতেও পারবে না।
হয়ত সময়ের প্রবাহে অভিক থাকবো না কিন্তু কবরের অন্ধকার ঘরে অভিকের মেয়ের কান্নার শব্দটা যে অভিককে প্রত্যেক সময় অস্থির করে তুলবে।
আর বেঁচে থাকার সময়টা অভিকের মেয়ের চোখের পানি অভিককে করে তুলেছে মুমূর্ষু । বেঁচে থেকে বাবার সামনে সন্তানের চোখের জল যে কতটা ভারী তা হয়ত যারা জানেন তারা ছাড়া অন্য কেউ তো বুঝবে না।
আজ অভিক প্রতি নিয়ত বয়ে চলছি সেই মুমূর্ষু জীবনটাকে ।
অভিক জানে না এর শেষ কোথায়?
অভিকের মৃত্যুতে?
নাকি অভিকের সম্পূর্ণ পরিবারের আত্মহত্যা তে?
এসব কোন প্রশ্নের উত্তর আসলে আমার জানা নেই,
আমি জানি না কেউ এর উত্তর জানেন কিনা ?

Comments
Post a Comment