Skip to main content

ছোট গল্প // ভুল ~ সিয়াম আহমেদ জয়

ভুল 

~ সিয়াম আহমেদ জয়

বুকের ওড়না সরাতে সরাতে আনিকা বললো— কাজ টা কী ঠিক হচ্ছে? 

উদয়ের কড়া জবাব— তোমার সাথে দীর্ঘ সাত বছরের প্রেম আমার আনিকা। তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেয়ার অধিকার কী আমার নেই? এই সাত সাত টা বছরে আমি তোমার হাত পর্যন্ত ধরতে চাইনি। তুমি বলেছিলে বিয়ের পরে সব হবে। মাঝপথে আমি দেশে না থাকাকালীন অন্যের স্ত্রী হয়ে গেলে। এখন আবার ফিরে আসতে চাইছো! আমি কী তাহলে তোমার শরীর টা চেয়ে ভুল করেছি? 

আনিকার মাথা নিচু হয়ে গেলো। 

উদয় মিথ্যে বলেনি। 

এক টাকার একটা চকলেট দুজনে ভাগ করে খাওয়ার প্রেম ছিলো তাঁদের। নিজের ইচ্ছাতেই এক সাংবাদিকের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলো। পারিবারিকভাবে ও না। আনিকার পরিবার উদয়কে পছন্দই করতো। আধনগ্ন হয়ে আনিকা বললো— তুমি আমার শরীরটাকেই ভালবাসো?

— আগে বাসতাম না আনিকা। এখন বাসি। অনেক বেশি ভালবাসি। মেয়েদের মনে কিচ্ছু নেই আনিকা। সব কচু পাতার পানির তুল্য। শরীরে তো সব আছে। 

কথাগুলো আনিকার রক্তে লবণ ছিটাচ্ছিলো। ভারমুখে গলা ছাড়লো— প্রেম করোনি ওখানে?

— প্রেম করার প্রয়োজন পড়েনি আনিকা। আমার বস ছিলো একজন ইরানী। জানোই তো ইরানী মেয়েরা কতো সুদর্শন হয়। সারাক্ষণ উনার পাশে থাকাটাই ছিলো আমার চাকুরী। 

— স্পষ্ট জবাব পেলাম না। 

উদয় জানালা টেনে বললো— একটা বাঙালি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিলো। নাইট ক্লাবে কাজ করলেও মেয়েটাকে আমার পবিত্রই মনে হয়েছিলো। ভালো বন্ধুত্ব হওয়ার সুবাধে তোমার কথা বলেছিলাম। এরপরে আর যোগাযোগ হয়নি। অন্য কোথাও চলে গিয়েছে হয়তো। 

— আর বাংলাদেশে? 

উদয় আবছা গতির একটা হাসি দিয়ে বললো— কাউকে মিথ্যে স্বপ্ন দেখাইনি। তোমার বিয়ের পরে কাউকে খুব কাছে পাওয়ার ইচ্ছে হলে পকেটে কয়েকশো টাকা নিয়ে পতিতালয়ে চলে গিয়েছি। 

— বেশ সোজাসাপটা কথা বলো তুমি! 

— সোজাসাপটা ভালোও বেসেছিলাম তোমায়। 

— এখন বাসো না?

— বাসি, তবে তোমার সুন্দর শরীরটাকে। তোমার মন তুমি ডাস্টবিনে ফেলে এসেছো। 

আনিকা জানালা টা বন্ধ করে দিলো। বন্ধ ঘর আনিকার খুব পছন্দ। কোথাও আলো নেই। কেউ বাঘের মতো শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়লেও অন্তত তাঁর মুখ টা দেখা যাবে না। 

— তুমি কী জানো আমি কেনো তোমার কাছে ফিরতে চাচ্ছি? 

— কারণ এখন আমি আর ছোটলোক নই। ঢাকা শহরে কয়েকটা ফ্ল্যাট আছে। সপ্তাহে সাত দিন সাত টা গাড়ি নিয়ে বের হই। ব্যাংক একাউন্টে প্রতি সেকেন্ডে টাকা ঢুকছে। 

— উদয় তোমার মনে আছে একদিন আমি তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম? আমাকে বসতে দেয়ার মতো জায়গা ও ছিলো না তোমাদের। 

— তারপরেও তুমি মায়ের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করেছিলে। 

— সেদিন তোমার মা বলেছিলো আমার মতো যদি উনার একটা মেয়ে থাকতো! 

— শুনেছিলাম আড়ালে দাঁড়িয়ে। ভালোই লেগেছিলো আমার। তোমাকে মায়ের মেয়েই বানাতাম। তবে ওসব বলে লাভ নেই। অতীত আমি ভুলিনি। 

আনিকা কান্নাস্বরে বললো— আমার দুটো মেয়ে আছে উদয়। 

— তোমার একটা শরীর এবং শরীরে শক্তিও আছে আনিকা। 

— ওদের ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। মা বাবার সামনে তো যেতে পারবো না। এখন আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই। অনেক কষ্টে তোমার দেখা পেয়েছি। তুমি আমার শরীর চাও আর কেটে টুকরো টুকরো করো। আমার দুটো মেয়েকে ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দাও প্লীজ। যদি বলো শক্তির কথা তবে হ্যাঁ আমি পঙ্গু নই, প্রতিবন্ধী নই, কিন্তু আমার সব রাস্তা যে বন্ধ। 

— তোমার সাংবাদিক স্বামী কোথায়?

— সে সাংবাদিক ছিলো না। কিন্তু আমার কাছে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছে। যাকগে সে কথা। সে এখন জার্মানিতে আছে বৌ বাচ্চা নিয়ে৷ আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। 

উদয় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো— তোমরা মেয়েরা খুব বোকা। তোমরা সন্তান জন্ম দিতে পারো যেখানে সেখানে যেভাবে খুশি। কিন্তু মা সব মেয়ে হতে পারে না আনিকা। বিশ্বস্ত হাত ছেড়ে দিয়েছিলে। যার হাত ধরেছিলে সে দুটো বাচ্চা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেলো। সে জানোয়ার, কিন্তু তুমিও মানুষ না। আমার একটু একটু করে গড়া স্বপ্নগুলোয় আগুন ধরিয়েছো। এখন মা হয়ে দুটো মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য পুরনো প্রেমিকের কাছে এসেছো। আমি চাইলেই তোমাকে সাহায্য করতে পারি। লক্ষ না কোটি টাকার চেক নিমিষেই দিতে পারি কিন্তু আমি তোমাকে এক পয়সাও সাহায্য করবো না। 

আনিকা বুকের কাপড় তুলে নিয়ে বললো— তবে আজকে আসি। 

— আজকের দিন টা পোড়াবে তোমায় খুব আনিকা। কারণ আমি তোমাকে দয়া দেখিয়েছি। তা কীভাবে বুঝে নাও। 

আনিকা চোখে পানি নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। উদয়ের বুকে ছিপছিপে ব্যথা। মেয়েটাকে সে ভালবাসে তবে দুঃখ দিতে চায়নি। কিন্তু তবুও আনিকাকে কথাগুলো বলা দরকার ছিলো উদয়ের। তা ভেবে বুকে পাথর চেপে আনিকাকে এতো নিচু নিচু কথা শুনিয়েছে। 

তারপর আর তাঁদের দেখা হয়নি। দুজন দুদিকে। একজন মেডিকেলের ছাত্রী হয়েও রাত্তিরে করছে গার্মেন্টস। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিউশনি। দুটো মেয়েকে মানুষ করতে হবে। ভালো স্কুলে পড়াতে হবে। দিনশেষে ঘুমুতে পারে না আনিকা। 

চোখবুঁজলেই উদয়ের চেহারা টা ভেসে উঠে। উদয়ের বুকের নিচে থাকলে আজকে তাঁর এতো কষ্ট করতে হতো না। ছেলে টা তাঁকে সত্যিই অনেক ভালবাসতো। প্রকৃত ভালবাসা হারানো যন্ত্রণার রেলগাড়ি টা থামছে না আনিকার! 

<><><><><><><><><><><><><>

Comments

Popular posts from this blog

বড় হাসির গল্পঃ- “বউ জব্দ”

  বড় হাসির গল্পঃ- “বউ জব্দ” করেছিলাম বাপু ভালবেসে বিয়ে, বউয়ের কতা শুনে মনে হবে এক আস্ত ডানা কাটা টিয়ে। সারাক্ষণ শুধু ঘ্যানার ঘ্যানার আর মশার মত প্যানার প্যানার। ওর আর দোষ কি বলুন, কথা তো দিয়েছিলাম আমিই, যে ওকে রাজরানী করে রাখব। বউকে আবার একটু শাসন করলেই বলে, যাব যেদিন বাপের বাড়ি, সব কাজ করবে তখন পরে বউয়ের শাড়ি।এটা কোন কতা হল কউন দিকি ভাই। এই বউয়ের অত্যাচারর থেকে ইংরেজদের অত্যাচার অনেক গুনে ভাল আসিল। এই তো সেদিন, বউ আমাকে কথায় কথায় কয়ে দিল, “যেমন বাপ তেমন ব্যাটা” আমিও বাপের ব্যাটা ছেড়ে কথা বলার পাত্র নই। কয়ে দিলাম, “তোর মা যেমন করে চাকরি, মেয়ে তেমনই জন্মেছে ফোকরি।“ অমনি ব্যস অমনি, শুরু হয়ে গেল অ্যাভেঞ্জার এন্ড গেম। যাকগে বাপু এবার মর্দা কতায় আসি। বউয়ের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে আমি ঠিক করি দিন পনেরোর ছুটি কাটাতে শিমলা যাব, তাও আবার বউ কে না জানিয়ে। দেখুক, আমি ছাড়া কেমন মজা সংসারে।অফিসে গরমের ছুটি নিয়ে চলে গেলুম শিমলা। শিমলা তে ছুটি কাটাচ্ছি বিন্দাস। বউয়ের কোন অত্যাচার নেই। সাথে ফোন নিয়ে আসিনি, তাই কেউ খোঁজও নিতে পারছে না। আহা আহা কি মজা। স্বর্গ আর কোথায়, এই ...

আধুনিক দাস ____অরন্য হাসান দেলোয়ার।

  আধুনিক দাস ____অরন্য হাসান দেলোয়ার।  কবি বলেছিলেন,ঢাকা খুবই ছোট্ট শহর। কারো কষ্টের কথা এখানে চাপা থাকে না। হয় কবি ভুল বলেছেন,নয়তো সময় সেটা ভুল প্রমাণিত করেছে। এখন এই শহরের বুকে অধিকাংশ মানুষই কষ্ট নিয়েই থাকে। অথচ,তাদের কাউকে দেখে মনেই হয় না তারা কষ্টে আছে। পুরুষগুলো হাসি মুখে নিজেদের উন্নতির বয়ান করে যায় চায়ের আড্ডায় বা আত্মীয়ের কাছে। নারীরা রঙ মেখে পরীর মতো সেঁজে গুজে সান্ধ্য পার্টিতে যায় কষ্ট বেঁচতে। এই শহরে কে কাঁদে আর কে খুন হয় তার কোন খবর এখন কেউ রাখে না... তুমি যে খুনের খবর পাও তা কর্পোরেট বিজ্ঞাপন টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়  কষ্ট তো বিক্রি করা যায় না তাই কর্পোরেট বিজনেস সেখানে ইনভেস্ট করে না। কেউ ধর্ষিতা হলে তুমি যে প্রতিবাদ সভা দেখতে পাও সেটার পিছনেও কর্পোরেট বিজনেস আসলে সবাই এখন দাস আধুনিক দাস প্রথার এক বিশাল সুবিধা হলো এখানে তোমাকে দাস ক্রয় করতে টাকা খরচ করতে হয় না... কোন একটি দল বা গ্রুপকে একটু উপরে তুলে দাও কিছু দালাল বুদ্ধিজীবী আর সাংবাদিক ভাড়া করো তারপর টক-শো নামক একটি নাটিকার রচনা করে তা মানুষের মস্তিষ্কের খালি স্থানে প্রবেশ করিয়ে দাও অসংখ্য দাসেরা লা...

পার্থিব সুখ ----খায়রুজ্জামান চৌধূরী টিংকু।

    পার্থিব সুখ ----খায়রুজ্জামান চৌধূরী টিংকু।  পুরুষ সেদিন সমুদ্র থেকে নদী দেখা পেলো মুহু মুহু সৌরভে আমোদিত অঙ্গন বাতাসে শিশিরের গান ভোরের শিশিরে শিহরণ ধীরেধীরে বিকশিত হলো প্রাণ আঁধারে তারার আলো জোছনায় আলোকিত রাত।  জোছনার আলোয় শরীর তার ভাসল রূপালী নদীর জলে জীবন বেলায় দু'জনে দু'জনার সঙ্গ পেল ঘন কুয়াশায়,  পৃথিবীর জমিনে আঁকাবাঁকা পথরেখা দিগ্বিজয়ের ভরসায় শুধালো প্রাচ্যে থেকে প্রতিচ্য পারহলো সমান্তরাল গিরিপথ চেতনার দীপ্ত প্রত্যয়ে ফুলে ওঠে বুক ভ্রমণ এলো কবিতায় এলো কোনো এক ঝর্ণার ধারে অবশেষে সন্যাসীর বেশে।  বিশ্বাসের প্রয়োজন নরম নিঃশ্বাসের মতো প্রান্তেরের শেষে মোহনার প্রান্তে অশোক যে জন মাশুকের তান্ডব খেলা, প্রেমে আনে সুখ, ধরেও প্রেমের বিষক্রিয়ার আসুখ। ওহে ধরনী, বধুয়ার লাজুক কপিন গ্রহন কর তুমি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকুক তোমার বুকে অন্তকাল, ভালোবেসে শেষে বিরহী সাজলে শুধু তোমাকেই দেখি পেছন ফিরে তাকালে রাণী তুমি সাধক ভিখারি.....।  প্রেম নদীতে স্রোত যায় বয়ে  রূপ যেনো তোমার বয়ে যায় শতধারায় ভাগাভাগি হয়ে, পার্থিব সুখের নাম বিষন্ন উদভ্রান্তের শুণ্য গৃহের অসু...